মৎস্যাসন :
পদ্মাসনে বসে কনুই -এ ভর দিয়ে শুয়ে পড়ুন। দু'হাতের সাহায্যে মাথা তুলে তালুর ছবির মত মাটিতে ঠেকান। পায়ের বুড়ো আঙ্গুল ধরে কনুই মাটিতে ছোঁয়ানোর চেষ্টা করুন। হাঁটু যেন মাটি থেকে উঠে না যায়। পা বদল করে মোট ৪ বার করুন; প্রতিবারে ৩০/৪০ সেকেন্ড করে করুন। কিন্তু শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে।
উপকারিতা :
এই আসন নিয়মিত অভ্যাসে বুকের খাঁচার আয়তন বৃদ্ধি পায়। যাদের বুকের খাঁচার গঠন ছোট, তাদের পক্ষে এই আসনটি বিশেষ উপকারী। ফুসফুসের স্থিতিস্থাপকতা অর্থাৎ সঙ্কোচন -প্রসারণ ক্ষমতা বাড়ে, শ্বাসনালী মোটা হয়।
ব্রঙ্ক্রাইটিস , হাঁপানি, সর্দি-কাশি প্রভৃতি রোগ নিবারণে সহায়তা করে। গলার স্বরের দোষ -ত্রুটি ও জড়তা দূর হয়। গলদেশে অবস্থিত প্যারা -থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ ভাল হয়; দেহে প্রয়োজন মত ক্যালসিয়াম উৎপাদন ও পরিপোষণে সহায়তা করে, হাড়ের গঠন ভাল হয়, দাঁতের রোগ হতে পারে না।
ঘাড়, কাঁধ, হাঁটু ও পায়ের ভাল ব্যায়াম হয়। মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বৃদ্ধি পায় ও কুজোভাব দূর হয়। গভীর শ্বাস -প্রশ্বাস সহযোগে এই আসনটি অভ্যাস করলে হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের কাজে বিশেষ উন্নতি হয়। মৎস্যাসন সর্বাঙ্গসনের পরিপূরক।
শশকাসন:
বজ্রাসনে বসে দু'হাত দিয়ে পায়ের গোড়ালি ধরুন। সামনে ঝুঁকে মাথার তালু মাটিতে ঠেকিয়ে কপাল হাঁটু সংলগ্ন করুন হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে থাকবে। এই অবস্থায় মেরুদণ্ডে বেশ টান পড়বে। ব্যথা অনুভব হলে মাথার তালুর নিচে পাতলা কাপড় ভাঁজ করে দিয়ে নেবেন। ৩০/৪০ সেকেন্ড করে ৩/৪ বার করুন। শ্বাস স্বাভাবিক। এই আসনটির পরে উস্ট্রাসন করা দরকার।
উপকারিতা :
এই আসনটি উচ্চতা বৃদ্ধির বিশেষ সহায়ক। এই অবস্থায় মেরুদন্ড লম্বালম্বিভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা প্রসারিত হয়। যারা উচ্চতায় কম, তাদের অবশ্য করণীয়। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্মরণশক্তি, চিন্তাশক্তি , দৃষ্টিশক্তি প্রভৃতি বাড়াতে সাহায্য করে।
থাইরয়েড, পিটুইটারি প্রভৃতি গ্রন্থি অধিক কার্যকরী হয়। দেহের পৃষ্ঠভাগ ও কাঁধ বেশ চওড়া হয়। মেরুদন্ডকে নমনীয় করতে এই আসনটি খুবই ফলপ্রসু। মেরুদণ্ডের ভালো ব্যায়াম হয়। লিভার, পাকস্থলী , প্যাংক্রিয়াস প্রভৃতির কাজ ভাল হয়। দেহের অপ্রয়োজনীয় মেদ কমায়। যাঁরা কোনও কারণে শীর্ষাসন অভ্যাসে অক্ষম, তাঁরা এই আসনটি করতে পারেন।
উস্ট্রাসন:
প্রথমে আপনি বজ্রাসনে বসুন। দু' হাঁটুতে ভর দিয়ে "নীল ডাউন" এর ভঙ্গিতে দাঁড়ান। দেহ পিছন দিকে কিছুটা বাঁকিয়ে প্রথমে ডান হাত ও পরে বাঁ হাতের তালু পায়ের পাতার উপর রাখুন। মাথা পিছন দিকে ঝুলিয়ে কোমর ও ঊরু সামনের দিকে এগিয়ে দিন।
এই অবস্থায় হাঁটুর উপর থেকে গলা পর্যন্ত দেহের সম্মুখভাগ বেশ টানটানভাবে থাকবে। শ্বাস স্বাভাবিক রেখে ৩০/৪০ সেকেন্ড করে ৪/৫ বার করুন।
উপকারিতা :
অর্ধমৎস্যেন্দ্রাসন:
দু'পা সোজা মেলে বসুন। ডান পা ভাঁজ করে ডান গোড়ালি বাঁ দিকের পাছার নীচে আনুন। এবার বাঁ পা ডান হাঁটুর পাশে ঊরু - সংলগ্ন লম্বালম্বিভাবে রাখুন। বাঁ হাঁটু ডান বগলের তলায় এনে ডান হাত দিয়ে ডান হাঁটু চেপে ধরুন। বাঁ হাত পিঠের দিকে নিয়ে মাথা ও কাঁধ যতটা সম্ভব বাঁ দিকে ঘোরান। ডান হাঁটু যেন মাটি থেকে উঠে না যায়।
অনুরূপভাবে হাত পা বদল করে শ্বাস স্বাভাবিক রেখে মোট ৪ বার করুন। প্রতিবার ৪০/৫০ সেকেন্ড থাকুন।
উপকারিতা :
এই আসনটি মেরুদণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ আসন বলা যেতে পারে। মেরুদন্ড দু'পাশে যেরূপ সুন্দরভাবে মোচড় খায়, অন্য কোনও আসনে তা হয় না। মেরুদন্ড সংলগ্ন স্নায়ু -পেশী সতেজ ও সবল হয়; মেরুদণ্ডের নমনীয়তা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে ,দেহ বেশ যৌবনোচিত থাকে। বেশী বয়সেও মেরুদন্ডে কাঠিন্যভাবে আসে না। পিঠ, ঘাড় ও কাঁধের ব্যথায় বিশেষ উপকারী। সার্ভাইক্যাল ও লাম্বার স্পন্ডিলাইটিস সারাতে সাহায্য করে।
বদ্ধ অর্ধমৎস্যেন্দ্রাসন:
উপকারিতা :
অর্ধমৎস্যেন্দ্রাসনের প্রায় সব উপকারিতাই এই আসনে আংশিকভাবে পাওয়া যায়।
ত্রিকোনাসন:
দু'পা আড়াই/তিন ফুট ফাঁক করে দাঁড়ান। দু'হাত দেহের দু'পাশে সোজা থাকবে। ডান হাত সোজা মাথার উপর তুলুন। দেহ বাঁ দিকে বাঁকিয়ে ডান হাত ভূমির সমান্তরালে আনুন। এবার বাঁ হাত আলতোভাবে বাঁ পায়ের গোড়ালির কাছে আলগাভাবে রাখতে হবে; তবে খেয়াল রাখতে হবে বাঁ হাতে যেন দেহের ভর না পড়ে।
ডান হাত করে কানের সাথে লেগে থাকবে। বাঁ দিকে বেঁকে ২ বার ও ডান দিকে বেঁকে ২ বার করুন। প্রতিবার ১ মিনিট করে থাকুন। শ্বাস-স্বাভাবিক থাকবে। দেহ যেন সামনের দিকে ঝুঁকে না যায়।
উপকারিতা :
আমাদের দেহের ল্যাটেরাল বেন্ডিং বা পাশে বাঁকানোর পক্ষে আসনটি বিশেষ প্রয়োজনীয়। ত্রিকোনাসনের দেহের দু'পাশে যেভাবে টান ও চাপ পড়ে, আমাদের সাধারণ কাজকর্ম ও চলাফেরায় বা অন্য কোনও আসনে সেভাবে টান বা চাপ পড়ে না। কাজেই এই আসনে দেহের দু'পাশের স্নায়ু -পেশী গুলির ভাল ব্যায়াম হয়।
মেরুদন্ড সবল ও নমনীয় হয়। পিঠ, ঘাঁড় ও কোমরের আড়ষ্টভাব দূর করে। কোমরের দু'পাশের পেশীতে টান পড়ায় ঐ অঞ্চলের অতিরিক্ত চর্বি হ্রাস পায়। লিভার , প্লীহা, প্যাংক্রিয়াস প্রভৃতির কাজ ভাল হয়।
কাকাসন:
সোজা দাঁড়িয়ে দু'হাত মাথার উপর তুলুন। সামনে ঝুঁকে দু'হাতের চেটো পায়ের কাছে মাটিতে রাখুন। হাতের কনুই না ভেঙে দু'হাঁটু বগলের কাছে এনে হাতে ভর দিয়ে দেহ কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে দিন। এবার আস্তে আস্তে দু'পা যতটা সম্ভব তুলুন। দু'পায়ের বুড়ো আঙ্গুল জোড়া থাকবে। সামনে দিকে তাকান।
শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে। ২০/৩০ সেকেন্ড করে ৪/৫ বার করুন।
উপকারিতা :
হাতের জোর অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কাঁধ ও ঘাড়ের পেশী সবল হয়। পেট ও তলপেটে বেশ চাপ পড়ে; অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করে। দেহ বেশ হালকা বোধ হয়। দৈহিক জড়তা দূর করে।
ময়ূরাসন:
হাঁটু গেড়ে বসে দু'হাতের চেটো সামনে মাটিতে রাখুন। হাতের আঙ্গুল পায়ের দিকে থাকবে। সামনে ঝুঁকে দু'কনুই একত্রে, নাভির কাছাকাছি রেখে হাতে ভর দিয়ে দেহ সামনের দিকে কিছুটা এগিয়ে দিন। এবার মাটি থেকে পা তুলে দেহ ভূমির সমান্তরালে আনুন। মাথা তুলে সামনে তাকান। প্রথম দিকে শ্বাস বন্ধ করে ময়ূরাসনে থাকতে সুবিধা হয়।
পরে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার চেষ্টা করতে হবে। ৩০/৪০ সেকেন্ড করে ৪/৫ বার করুন।
উপকারিতা :
পেট ও বুকে প্রচন্ড চাপ পড়ায় দেহের অভ্যন্তরস্থ যন্ত্রাদির কাজ খুব ভাল হয়। লিভার, প্যাংক্রিয়াস, প্লীহা, পাকস্থলী, ক্ষুদান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ে, ফলে হজম ভাল হয়; হঠাৎ পেটের কোনও গোলমাল হতে পারে না, হলেও তারতারি সেরে যায়। হাতের আঙ্গুল ও কব্জিসহ সমস্ত হাতের এবং ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের পেশীর গঠন ভাল হয়, হাতের জোর বাড়ে।
দৈহিক ভারসাম্য বৃদ্ধি পায় হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়ে।
নিষেধ :
হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ময়ূরাসন করা উচিৎ নয়।








0 মন্তব্যসমূহ